কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬ এ ১১:৫৮ AM

গাইবান্ধা জেলার ভৌগলিক বিবরণ

কন্টেন্ট: পাতা

গাইবান্ধা জেলার ভৌগোলিক পরিচিতি

পটভূমি

ইতিহাসে মানব জাতির সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের প্রতিচ্ছবি প্রতিফলিত হয়। আর ইতিহাস রচনায় ভিত হিসেবে মানুষের ভৌগলিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশের তথা ভূগোলের গুরুত্ব অপরিসীম। অধ্যাপক ডাডলি স্ট্যাম্পের মতানুসারে—

“মানুষের আবাসস্থল হিসাবে পৃথিবী সম্বন্ধে পাঠ, মানুষ ও তার কর্মকাণ্ডের প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রভাব আলোচনাই হলো ভূগোল।”

প্রকৃতির কোলে লালিত মানুষের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক বিবর্তন, পরিবর্তন ও পরিবর্ধন ভৌগোলিক অবস্থার উপর নির্ভরশীল। তাই কোনো দেশের বা অঞ্চলের আঞ্চলিক ইতিহাস-ঐতিহ্য রচনায় সর্বাগ্রে প্রয়োজন সেই অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান, ভূ-প্রকৃতি, জলবায়ু, নদ-নদী, সমুদ্র, প্রাকৃতিক সম্পদ, কৃষি উৎপাদন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পর্কে সম্যক আলোচনা। গাইবান্ধা জেলার ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রেও জেলার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যসমূহের সংক্ষিপ্ত আলোচনা অপরিহার্য।

অবস্থান

উত্তরবঙ্গের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী জনপদ গাইবান্ধা জেলা ব্রহ্মপুত্র নদের ডান তীরে অবস্থিত। জেলার ভৌগোলিক অবস্থান:

  • উত্তর অক্ষাংশ: ২৫°০৩′ থেকে ২৫°৩৯′
  • পূর্ব দ্রাঘিমাংশ: ৮৯°১২′ থেকে ৮৯°৪২′

সীমানা

গাইবান্ধা জেলার চারদিকের সীমানা নিম্নরূপ—

দিকসীমানা
উত্তরতিস্তা নদী ও কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী উপজেলা
উত্তর-পশ্চিমরংপুর জেলার পীরগাছা উপজেলা
পশ্চিমরংপুর জেলার মিঠাপুকুর ও পীরগঞ্জ উপজেলা এবং দিনাজপুর জেলার ঘোড়াঘাট উপজেলা
দক্ষিণ-পশ্চিমজয়পুরহাট জেলার কালাই উপজেলা
দক্ষিণবগুড়া জেলার শিবগঞ্জ ও সোনাতলা উপজেলা
পূর্ববহমান ব্রহ্মপুত্র নদ

আয়তন ও প্রশাসনিক কাঠামো

গাইবান্ধা জেলা নিম্নোক্ত ৭টি উপজেলা নিয়ে গঠিত—

  1. সদর
  2. সুন্দরগঞ্জ
  3. সাদুল্লাপুর
  4. পলাশবাড়ী
  5. গোবিন্দগঞ্জ
  6. ফুলছড়ি
  7. সাঘাটা

এছাড়া জেলায় রয়েছে—

  • ৮২টি ইউনিয়ন
  • ১১০১টি মৌজা
  • ৪টি পৌরসভা (সদর ও গোবিন্দগঞ্জসহ)

পরিসংখ্যান

  • মোট আয়তন: ২১৭৯.২৭ বর্গকিলোমিটার
  • নদীয় আয়তন: ১০৭.৭ বর্গকিলোমিটার
  • জনসংখ্যা (১৯৯১ সালের আদমশুমারি): ১৯,৪৯,২৭৪ জন

ভূ-তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য

গাইবান্ধা জেলা বৃহত্তর বঙ্গ প্লাবনভূমিতে অবস্থিত হলেও এর উপর দিয়ে প্রবাহিত নদীসমূহের গতিপথ পরিবর্তন এবং ভূ-কম্পনজনিত ভূ-উত্তোলনের ফলে জেলার ভূমি গঠনের বৈশিষ্ট্য অন্যান্য জেলার তুলনায় কিছুটা ভিন্নতর। জেলার অধিকাংশ ভূমি নদীবাহিত পলল দ্বারা গঠিত।

ভূ-প্রকৃতি

কোন দেশের কৃষি, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং জনবসতির উপর সেই দেশের ভূ-প্রকৃতি ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে।

ভূ-প্রকৃতির ভিত্তিতে বাংলাদেশের ভূমিকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়—

(ক) টারশিয়ারী যুগের পাহাড়সমূহ

টারশিয়ারী যুগে (আনুমানিক ৭৫ মিলিয়ন বছর আগে) হিমালয় পর্বত উত্থিত হওয়ার সমসাময়িক কালে এসব টিলা ও পাহাড়ের সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করা হয়। তবে এই পাহাড় শ্রেণীর কোনো বৈশিষ্ট্য গাইবান্ধা জেলায় লক্ষ্য করা যায় না।

(খ) প্লায়স্টোসিন যুগের সোপানসমূহ

প্রায় ১৩ লক্ষ বছর পূর্বে সূচনা হয়ে ২৫,০০০ বছর পর্যন্ত কালকে প্লায়স্টোসিন যুগ বলা হয়।

গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ-পূর্বাংশের কয়েকটি ইউনিয়নে এ ধরনের বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, যা স্থানীয়ভাবে ‘খিয়ার’ এলাকা নামে পরিচিত।

(গ) নবীন ভূ-তাত্ত্বিক যুগের প্লাবন সমভূমি

টারশিয়ারী যুগের পাহাড় এবং প্লায়স্টোসিন যুগের সোপান ব্যতীত বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকা নবীন ভূ-তাত্ত্বিক যুগে (আনুমানিক ২৫,০০০ বছরের কম সময়ে) গঠিত হয়েছে। গাইবান্ধা জেলার অধিকাংশ ভূমিও এই শ্রেণিভুক্ত।

জেলার বৈশিষ্ট্য:

  • টারশিয়ারী যুগের পাহাড় নেই।
  • দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে বরেন্দ্রভূমির কিয়দংশ রয়েছে।
  • অবশিষ্ট প্রায় ৯০% ভূমি নবীন প্লাবন সমভূমি।
  • ব্রহ্মপুত্র, করতোয়া ও তিস্তা নদীর পলল দ্বারা গঠিত।

ভূ-প্রকৃতিগত বিভাগ

FAO (১৯৯১) অনুযায়ী জেলাটিকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়—

  1. প্লাবন সমভূমি
  2. বরেন্দ্র সমভূমি

মাটির শ্রেণী

মাটির বুনটের ভিত্তিতে গাইবান্ধার মাটিকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়—

১. বেলে মাটি

ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও করতোয়া নদীবিধৌত চরাঞ্চলে বেলে মাটি দেখা যায়।

উৎপাদিত ফসল:

  • চিনাবাদাম
  • চিনা
  • কাউন
  • সরিষা
  • আখ
  • তরমুজ

২. দোঁয়াশ মাটি

নদীতীরবর্তী বেলে মাটি এবং পশ্চিমের বরেন্দ্র অঞ্চল ব্যতীত জেলার অধিকাংশ ভূমি দোঁয়াশ মাটি দ্বারা গঠিত।

৩. এটেল মাটি

গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার খিয়ার অঞ্চলে এটেল ও দোঁয়াশ মাটির সংমিশ্রণ দেখা যায়।

উৎপাদিত ফসল:

  • ধান
  • গম
  • ভুট্টা

তবে পাট ও সবজির উৎপাদন তুলনামূলক কম হয়।

খরা ও দুর্ভিক্ষ

এই অঞ্চলে বন্যার মতো দীর্ঘস্থায়ী অনাবৃষ্টি বা খরাও বিভিন্ন সময়ে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করেছে। খাদ্যদ্রব্যের দুষ্প্রাপ্যতা ও কর্মসংস্থানের অভাব দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল।

উল্লেখযোগ্য খরার সময়কাল

  • ১৭৬৮–৬৯
  • ১৮৫৭–৫৮
  • ১৮৬২–৬৩
  • ১৮৬৬–৬৭
  • ১৮৭৪
  • ১৯০৮–০৯
  • ১৯৯২–৯৩

এর মধ্যে ১৮৭৪ এবং ১৯০৮–০৯ সালের দীর্ঘস্থায়ী খরা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

১৮৬৬ সালে যেখানে এক টাকায় ৯৩ সের চাল পাওয়া যেত, খরার ফলে তা নেমে আসে মাত্র ৮ সেরে। তবে পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে খাদ্য আমদানি এবং পরবর্তী রবি ফসল উৎপাদনের ফলে পরিস্থিতি দুর্ভিক্ষে রূপ নেয়নি।

১৭৬৯–৭০ সালের দুর্ভিক্ষ

১৭৬৮ সালের অনাবৃষ্টির ফলে সাবেক রংপুর জেলার কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৭৬৯–৭০ সালের দুর্ভিক্ষে বাংলার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ প্রাণ হারায়।

সিরাজুল ইসলামের বাংলার ইতিহাস: ঔপনিবেশিক শাসন কাঠামো গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে বৃহত্তর রংপুর জেলার অন্তর্গত বর্তমান গাইবান্ধা অঞ্চলও এই দুর্ভিক্ষে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

১৯০৭–১৯০৮ সালের খরা

পরপর দুই বছরের খরা জেলার ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ ঘটনা। বিশেষ করে—

  • খিয়ার অঞ্চল
  • গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার পশ্চিমাংশ
  • মিঠাপুকুর
  • পীরগঞ্জ

এলাকাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

বর্তমানে আধুনিক সেচব্যবস্থা এবং বোরো চাষের সম্প্রসারণের ফলে উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দুর্ভিক্ষের সম্ভাবনা অনেকাংশে কমেছে।

ভূমিকম্প

ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা তথা আসাম অঞ্চলে ভূমিকম্পের হার তুলনামূলক বেশি। গাইবান্ধা জেলা এই ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলের নিকটবর্তী হওয়ায় এখানে মাঝেমধ্যে ভূকম্পন অনুভূত হয়।

১৮৮৫ সালের ভূমিকম্পের সরকারি রেকর্ড পাওয়া গেলেও ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্প বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

১৮৯৭ সালের মহাভূমিকম্প

তারিখ: ১২ জুন ১৮৯৭
সময়: বিকেল ৫টা ১৫ মিনিট

এই ভূমিকম্প বাংলা, বিহার ও আসাম অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করে।

প্রভাব

  • ঘরবাড়ি ধ্বংস
  • রাস্তাঘাট ও সেতু বিধ্বস্ত
  • রেলপথ ক্ষতিগ্রস্ত
  • আবাদি জমি বালুচরে পরিণত
  • ভূমির উচ্চতা বৃদ্ধি

এছাড়া—

  • সারাই নদী
  • মানস নদী
  • আখিরা খাল
  • নলেয়া খাল
  • ঘাঘট নদী

ইত্যাদির প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়।

অনেক বিল আবাদি জমিতে পরিণত হয়, আবার বহু উঁচু জমি গভীর জলাভূমিতে রূপ নেয়। ফলে গাইবান্ধা মহকুমার ভৌগোলিক ও পরিবেশগত কাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে।


উপসংহার

গাইবান্ধা জেলার ভূপ্রকৃতি, মাটির গঠন, নদ-নদী, খরা, বন্যা এবং ভূমিকম্পজনিত পরিবর্তনসমূহ জেলার ইতিহাস, অর্থনীতি ও জনজীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। জেলার আঞ্চলিক ইতিহাস ও ঐতিহ্য অনুধাবনের জন্য এর ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান অপরিহার্য।

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন