কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬ এ ১২:১৩ PM
কন্টেন্ট: পাতা
বৌদ্ধ, হিন্দু, মোঘল, পাঠান আমলসহ ইংরেজ শাসনামলের স্মৃতি বিজড়িত আমাদের এই গাইবান্ধা জেলা। বিভিন্ন শাসনামলে নানা সংগ্রাম-বিদ্রোহ এ অঞ্চলে সংঘটিত হয়েছে।
গাইবান্ধা আদিতে কেমন ছিল সে বিষটি প্রথমে আলোচনা করা দরকার। বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য এ ব্যাপারে বেশ কিছু ধারণা দেয়। গাইবান্ধা জেলার মূল ভূখণ্ড নদীর তলদেশে ছিল এবং কালক্রমে যা নদীবাহিত পলিতে ভরাট হয়।
পরবর্তীতে এতদঞ্চলে সংঘটিত একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের ফলে নদী তলদেশের উত্থান ঘটে এবং স্থলভূমিতে পরিণত হয়।
তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীবাহিত পলি মাটি দিয়েই গড়ে উঠেছে আজকের গাইবান্ধা।
জেলা শহরের বর্তমান অবস্থানের গাইবান্ধা নামকরণ ঠিক কবে নাগাদ হয়েছে তার সঠিক তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি।
তবে রংপুরের কালেক্টর ই. জি. গ্লেজিয়ার ১৮৭৩ সালে যে রিপোর্ট প্রণয়ন করেছিলেন, সেই রিপোর্টে গাইবান্ধা নামটি ইংরেজিতে GAIBANDA হিসেবে লেখা হয়েছে এবং এর অবস্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ঘাঘট নদীর পাড়ের কথা।
রংপুরের গ্লেজিয়ার সাহেবের পূর্বে কালেক্টর ছিলেন জেমস রেনেল। তাঁর প্রণীত Rennel Journals থেকে জানা যায়, ১৭৯৩ সালে উত্তরবঙ্গে পুনর্ভবা, ধরলা, তিস্তা, মানস এবং ঘাঘট খাল নৌ-পরিবহনে সহায়ক ছিল।
জেমস রেনেল এবং ই. জি. গ্লেজিয়ার—দুজন কালেক্টরের রিপোর্টেই অবশ্য ঘাঘটকে খাল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেদিক থেকে বোঝা যায়, ১৭৯৩ সালেও ঘাঘট নদী সে সময়ের অন্যান্য নদীর তুলনায় অপেক্ষাকৃত ছোট আকৃতির ছিল বলেই একে খাল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আবার এই তথ্য থেকে আরেকটি বিষয়ও বলা যায় যে, ১৭৯৩ সালেও মানস নদী ছিল, ঘাঘট নদীর মতোই।
অপর যে বিষয়টি এই দুটি তথ্য থেকে অবহিত হওয়া যায়, তা হলো—১৭৯৩ সালে গাইবান্ধা নামটি উল্লেখযোগ্য ছিল না। কিন্তু ১৮৭৩ সালে ই. জি. গ্লেজিয়ার তাঁর রিপোর্টে GAIBANDA নামটি উল্লেখ করেন।
সম্ভবত ১৭৯৩ সালের আগে ঘাঘট নদীর তীরবর্তী এই স্থানটি একটি পতিত ভূমি এবং গোচারণ ভূমি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। জনবসতি ছিল না বলেই রংপুরের কালেক্টরদের রিপোর্টে গাইবান্ধা নামটি ১৮৭৩ সালের আগে উল্লেখিত হয়নি।
উপরের তথ্যগুলো থেকে ধারণা করা যায় যে, গাইবান্ধা অঞ্চলটি প্রথমদিকে ছিল নদীবাহিত পলিতে গঠিত একটি বিস্তীর্ণ চর ও গোচারণভূমি। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে এখানে জনবসতি গড়ে ওঠে এবং প্রশাসনিকভাবে অঞ্চলটির পরিচিতি লাভের সঙ্গে সঙ্গে গাইবান্ধা নামটিও সরকারি নথিতে স্থান পায়।
গাইবান্ধার নামকরণ সম্পর্কে দুটি কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় কিংবদন্তিটি মহাভারতের মৎস্য দেশের রাজা বিরাটকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।
প্রচলিত কিংবদন্তি অনুসারে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে মৎস্য দেশের রাজা বিরাটের রাজধানী ছিল বর্তমান গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ এলাকায়।
মহাভারতের কাহিনিতে বলা হয়েছে, পঞ্চপাণ্ডব তাঁদের ১২ বছরের বনবাস শেষে পরবর্তী ১ বছর অজ্ঞাতবাসের সময় রাজা বিরাটের রাজসভায় ছদ্মবেশে অবস্থান করেছিলেন।
প্রচলিত কিংবদন্তি অনুযায়ী, রাজা বিরাটের গো-ধনের কোনো তুলনা ছিল না। তাঁর গাভীর সংখ্যা ছিল প্রায় ষাট হাজার। এত বিপুল সংখ্যক গবাদিপশুর জন্য একটি বিশাল গোশালা নির্মাণ করা হয়েছিল।
মাঝেমধ্যে ডাকাতরা এসে বিরাট রাজার গাভী লুণ্ঠন করে নিয়ে যেত। এ কারণে রাজা বিরাট একটি বিশাল পতিত প্রান্তরে গোশালা স্থাপন করেন। গোশালাটি এমন স্থানে নির্মাণ করা হয়, যেখানে পর্যাপ্ত ঘাস ও নদীর পানি ছিল, যাতে গাভীগুলোর খাদ্য ও পানির অভাব না হয়।
সেই নির্দিষ্ট স্থানে প্রতিদিন হাজার হাজার গাভীকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হতো। স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে এই স্থানটি পরিচিতি পায় "গাই-বাঁধা" নামে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উচ্চারণের পরিবর্তনে "গাইবাঁধা" শব্দটি রূপ নেয় বর্তমান "গাইবান্ধা" নামে।
গাইবান্ধা জেলার ইতিহাস নদী, পলিমাটি, প্রাচীন জনপদ এবং লোককথার এক অনন্য সমন্বয়। বিভিন্ন ঐতিহাসিক নথি থেকে জানা যায় যে, এই অঞ্চলের বিকাশ হয়েছে নদীবাহিত পলির মাধ্যমে এবং ধীরে ধীরে এখানে জনবসতি গড়ে ওঠে।
অন্যদিকে স্থানীয় কিংবদন্তি গাইবান্ধার নামকরণকে রাজা বিরাটের বিশাল গো-ধনের সঙ্গে যুক্ত করেছে। যদিও এ কিংবদন্তির ঐতিহাসিক প্রমাণ সীমিত, তবুও এটি এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও লোকবিশ্বাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।